বাংলাদেশে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার বিষয়টি মূলত নির্ভর করে দূরুত্ব, অ্যাম্বুলেন্সের ধরন এবং বর্তমান ট্রাফিক পরিস্থিতির ওপর। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য বাংলাদেশের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ভাড়ার একটি বিস্তারিত গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ভাড়া

বিপদে পড়লে আমরা প্রথমেই অ্যাম্বুলেন্স খুঁজি। কিন্তু সেই বিপদের মুহূর্তে ভাড়ার সঠিক ধারণা না থাকায় অনেক সময় আমাদের বাড়তি টাকা গুনতে হয় অথবা সঠিক সেবাটি পেতে দেরি হয়। বাংলাদেশে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালায় সব সময় চলে না, তবে একটি বাজারদর প্রচলিত আছে।

অ্যাম্বুলেন্সের প্রকারভেদে ভাড়ার পার্থক্য

অ্যাম্বুলেন্সের ধরন অনুযায়ী এর ভাড়া ভিন্ন হয়। প্রধানত বাংলাদেশে তিন ধরনের অ্যাম্বুলেন্স দেখা যায়:

নন-এসি অ্যাম্বুলেন্স

নন-এসি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সবচেয়ে সাশ্রয়ী। সাধারণত স্বল্প দূরত্বে রোগী আনা-নেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। ঢাকা শহরের ভেতরে এর ভাড়া সাধারণত ১২০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।

এসি অ্যাম্বুলেন্স

বর্তমান সময়ে এসি অ্যাম্বুলেন্স সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। গরম ও যানজটের এই শহরে রোগীর আরাম ও স্থিতিশীলতার জন্য এসি অ্যাম্বুলেন্স সেরা। ঢাকা শহরের ভেতর এর ভাড়া ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে হয়। তবে দূরপাল্লার ক্ষেত্রে ভাড়া কিলোমিটারে বা আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারিত হয়।

ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্স

মৃতদেহ পরিবহনের জন্য এই অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহৃত হয়। এতে মরদেহ পচন রোধে বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। এর ভাড়া সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের চেয়ে কিছুটা বেশি হয়। শহরের ভেতরে ২৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

আইসিইউ বা সিসিইউ অ্যাম্বুলেন্স

এগুলো চলন্ত হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত। এতে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, ভেন্টিলেটর এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা প্যারামেডিক থাকে। মুমূর্ষু রোগীর জন্য এটি জরুরি। এর ভাড়া ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে অনেক বেশি হতে পারে।

ঢাকা শহরের ভেতরে ভাড়া

ঢাকার মধ্যে ভাড়ার বিষয়টি মূলত এলাকার ওপর নির্ভর করে। যেমন—মহাখালী থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার ভাড়া আর উত্তরা থেকে পুরান ঢাকা যাওয়ার ভাড়া এক হবে না।

  • স্বল্প দূরত্ব: ১২০০ – ১৫০০ টাকা।
  • মাঝারি দূরত্ব: ১৫০০ – ২০০০ টাকা।
  • দীর্ঘ দূরত্ব: ২০০০ – ৩০০০ টাকা।

ঢাকা থেকে বাইরের জেলায় ভাড়া

যখন আপনি ঢাকা থেকে অন্য জেলায় রোগী পাঠাবেন বা অন্য জেলা থেকে ঢাকায় রোগী আনবেন, তখন ভাড়া নির্ধারিত হয় রাস্তার দূরত্ব এবং জ্বালানি খরচের ওপর।

  • কাছাকাছি জেলা: ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
  • মাঝারি দূরত্বের জেলা: ৬০০০ থেকে ৮০০০ টাকা।
  • দূরবর্তী জেলা: ১২,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা।
  • অনেক দূরের জেলা: ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

মনে রাখতে হবে যে এই ভাড়ার সাথে অনেক সময় টোল (ব্রীজ বা হাইওয়ে টোল) যুক্ত থাকে। ভাড়া কথা বলার সময় টোল কে দেবে তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।

ভাড়া নির্ধারণে যে বিষয়গুলো প্রভাব ফেলে

অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া সব সময় এক থাকে না। কিছু বিষয় ভাড়া বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিতে পারে:

  • অপেক্ষা করার সময়: অ্যাম্বুলেন্স গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যদি দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, তবে প্রতি ঘণ্টার জন্য আলাদা চার্জ দিতে হতে পারে (সাধারণত ২০০-৫০০ টাকা প্রতি ঘণ্টা)।
  • রাতের সার্ভিস: গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে অনেক সময় চালকরা কিছুটা বাড়তি ভাড়া দাবি করতে পারেন।
  • অক্সিজেন ও ঔষধ: যদি রোগীর অতিরিক্ত সিলিন্ডার অক্সিজেন বা বিশেষ কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয়, তবে তার খরচ ভাড়ার বাইরে যুক্ত হতে পারে।
  • ফেরত আসা: সাধারণত দূরপাল্লার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স খালি ফিরে আসবে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে ভাড়া ঠিক করা হয়।

সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা

আপনি যদি অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা চান, তবে সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া সরকার নির্ধারিত এবং তা খুবই কম (কিলোমিটার প্রতি হিসেবে)। তবে অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স খালি পাওয়া যায় না, সেক্ষেত্রে বেসরকারি সার্ভিসই একমাত্র ভরসা।

কিছু বিশেষ সতর্কতা

ভাড়া ঠিক করার পর অ্যাম্বুলেন্স এলে দেখে নিন তাতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন আছে কি না এবং এসির অবস্থা কেমন। অনেক সময় কম ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স বুক করলে তারা এসি ছাড়ে না বা পুরনো গাড়ি পাঠায়। তাই বুকিংয়ের সময় গাড়ির মডেল এবং সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।

উপসংহার:

অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে শুরুতেই শান্ত মাথায় কথা বলুন। একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকলে আপনি যেমন ঠকবেন না, তেমনি রোগীও সঠিক সময়ে সঠিক সেবা পাবে। মনে রাখবেন, বিপদের সময় সঠিক তথ্যের চেয়ে বড় শক্তি আর কিছু নেই।